বাগেরহাট জেলার নাম শুনলে সবার আগে যেটি মাথায় আসে তার নাম ষাটগম্বুজ মসজিদ। এটি বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে বৃহত্তম এবং ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম  নিদর্শন। ষাটগম্বুজ মসজিদের নির্মাণকাল, গম্বুজ সংখ্যা, নামকরণ আর স্থাপত্য নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন মতাদর্শ। 
 ষাট গম্বুজ মসজিদ; আধুনিক স্থপত্যের  সূচনা উপাখ্যান
ছবিঃ উইকিমিডিয়া 

শত শত বর্ষ আগের কথা।  বাগেরহাট শহরের নাম ছিল তখন খলিফাবাদ। আর এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন খান আল-আজম উলুগ খান জাহান। দক্ষিণ বাংলার একটি বৃহৎ অংশ ছিল তার দখলে।  তাই মনে করা হয় খান জাহান আলীই সম্ভবত ষাটগম্বজ মসজিদের নির্মাতা। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি না থাকায় এটি কে নির্মাণ করেছিলেন বা কোন সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল সে সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তাই মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখেই নিশ্চিত করা হয় যে এটি খান জাহান আলী সম্ভবত  ১৫শ শতাব্দীর দিকে নির্মাণ করেছিলেন। অনেক বছর ধরে ও বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল ষাট গম্বুজ মসজিদটি। এখানে ব্যবহৃত পাথরগুলো আনা হয়েছিল সুদূর  রাজমহল থেকে। মনে করা হয় খানজাহান আলী বৈঠক করার জন্য একটি দরবার হল গড়ে তোলেন, যা পরবর্তীতে ষাট গম্বুজ মসজিদ হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে এই মসজিদটিতে তুঘলকি ও জৌনপুরী নির্মাণশৈলী সুস্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। 
 ষাট গম্বুজ মসজিদ; আধুনিক স্থপত্যের  সূচনা উপাখ্যান
ছবিঃ উইকিমিডিয়া 


বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদটি খান জাহানের সর্বপ্রথম ও সর্বোৎকৃষ্ট স্থাপত্যিক নিদর্শন । বাইরের দিক থেকে  মসজিদটি দেখতে যেমন দৃষ্টিনন্দন ভেতরের দিক থেকেও তেমনিই আকর্ষণীয়। মসজিদের অলঙ্করণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহৃতহয়েছে পোড়ামাটির ফলক ও ইট । তাছাড়া কিছু হালকা রিলিফের খোদাইকৃত বিরল প্রস্তরের ব্যবহার ও করা হয়েছে । সমস্ত মসজিদ ভবনের কার্নিস, অভিক্ষিপ্ত উত্থিত বন্ধনী এবং কর্নার টাওয়ারের কার্নিস এক বিশেষ ধরণের নকশা দ্বারা সজ্জিত। মসজিদটির ভেতরের আয়তাকার কাঠামোর ভেতর ন্যস্ত খিলানপথের উপরের অংশ নকশা বিশিষ্ট ইট দ্বারা সজ্জিত। এছাড়াও মসজিদটির ভেতরে ও বাইরে জোড়া গোলাপ,  লতাপাতা সহ বিভিন্ন নকশা দ্বারা সজ্জিত। মসজিদটির খিলানপথের উপরে কিছুটা অভিক্ষিপ্ত তিনটি অনুভূমিক বন্ধনী রয়েছে। বন্ধনী তিন্টির নিচেরটিতে রয়েছে ঝুলানো ফুল নকশা, মাঝেরটি লজেন্স ও ছোট গোলাপ নকশার মিশ্রিত নকশায় শোভিত এবং উপরেরটিতে রয়েছে চারপাতা যুক্ত ফুলের অলঙ্করণ। এই মসজিদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো কেন্দ্রীয় মিহরাবের পাশে নির্মিত ক্ষুদ্র প্রবেশপথ। যার সাথে উত্তর ভারতের কিছু মসজিদের মিল পাওয়া যায়। এটি প্রমাণ করে যে মসজিদটি আদি মুসলিম স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত ।
৬শ বছরের পুরাতন এ মসজিদের নামকরণ সম্পর্কে অনেকের ধারণা, গম্বুজ ছাড়া আলাদা কোনো ছাদ নেই বলে একে ‘ছাদ গম্বুজ’ মসজিদ বলা হতো। তবে আভিধানিকভাবে ‘ষাটগম্বুজ’ অর্থ হলো ষাটটি গম্বুজ সম্বলিত। এজন্য মসজিদটি ষাট গম্বুজ নামেই বেশি পরিচিত। তাছাড়া কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত সাতটি চৌচালা ভল্ট এর জন্য  মসজিদটিকে ‘সাতগম্বুজ’ ও বলা হয়। তবে সময়ের স্রোতে এই ‘সাতগম্বুজ’ই ‘ষাটগম্বুজ’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে।

 ষাট গম্বুজ মসজিদ; আধুনিক স্থপত্যের  সূচনা উপাখ্যান
ছবিঃ উইকিমিডিয়া 

ষাট গম্বুজ মসজিদের গম্বুজের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে ভিন্ন মত।  ষাট গম্বুজ মসজিদে আসসে গম্বুজ রয়েছে ৭০টি। ৭টি রয়েছে চৌচালা গম্বুজ, যা গম্বুজের যথাযথ সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। আর চার কোণায় রয়েছে চারটি মিনার। এই মিনারগুলোকে  ইসলামের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়।  । এর মাথায় যে চারটি গম্বুজ রয়েছে একে গম্বুজ না বলে অনুগম্বুজ ও  বলা হয়।  তাই এদিক থেকে ধরলে  প্রকৃত গম্বুজ ৭০টি। আর সব ধরলে গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি।
নির্মাণকাল, গম্বুজ সংখ্যা,  নামকরণ নিয়ে মতবাদ থাকলেও ষাট গম্বুজ মসজিদ বাগেরহাট জেলা কে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো ষাট গম্বুজকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটি হিসেবে সম্মান প্রদান করে।